পরীক্ষাকালীন রুটিন নষ্ট হবেনা এক সেকেন্ডও


পরীক্ষাকালীন রুটিন নষ্ট হবেনা এক সেকেন্ডও




ছাত্রজীবনে সবচেয়ে প্যারাদায়ক জিনিসটার
কথা যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তাহলে বেশিরভাগ
উত্তরই আসবে “পরীক্ষা”! এটা নিশ্চিতভাবে-
বলে দেয়ার জন্য কোনো আলাদা জরিপের
প্রয়োজন হয় না। এই পরীক্ষার জন্য যে
কতজনের আরামের ঘুম হারাম হয়ে যায় তার
কোনো ইয়ত্তা নেই। পরীক্ষা ভালো হবে
নাকি খারাপ, প্রশ্ন কেমন করবে, পরীক্ষার
হলে সবকিছু সময়ের মধ্যে লিখে আসতে
পারবো তো এরকম নানা প্রশ্ন আমাদের মাথায়
ঘুরপাক খেতে থাকে পরীক্ষার সময়।
পরীক্ষার সময় অনেকের মনেই ভয় কাজ
করে যে সবকিছু সময়ের মধ্যে পড়ে শেষ
করতে পারবে কিনা। অনেকে তো আবার
পড়তে পড়তে ভুলেই যায় যে সে শেষ
কবে ঘুমিয়েছিলো! অনেকেই আবার
আফসোস করে, “ইশ! আর একটা দিন যদি বাড়তি
সময় পেতাম!” যদিও এই বাড়তি সময়টা পেলেও
অনেকে না পড়েই কাটিয়ে দেয়। কিন্তু পরে
আবার ঠিকই আফসোস করে এই ভেবে যে,
সিলেবাসটা আর শেষ করা হলো না। এই ধরণের
আফসোস যাতে না করতে হয়, সে জন্য
পরীক্ষার সময় নিজের একটি রুটিন রাখা উচিৎ।
কোন পরীক্ষা কবে হবে সেটা জানিয়ে
আমাদের স্কুল কিংবা কলেজ থেকে একটি রুটিন
দেয়া হয়। কিন্তু সেই রুটিনে তো এটি বলা
থাকে না যে কোন পরীক্ষার জন্য আমাদের
কীভাবে প্রস্তুতি নেয়া উচিৎ। আজ আমরা এমন
কিছু টিপস জেনে নিবো যেগুলো মেনে
চললে পরীক্ষার পূর্বে নির্ধারিত সময়ের
মধ্যেই সিলেবাস শেষ করে সেটির রিভিশন
দিয়ে তারপর পরীক্ষা দিতে যেতে পারবো।
পরীক্ষার সময় চাই বিশেষ
To
১. ক্যালেন্ডারে পরীক্ষার
তারিখগুলো দাগিয়ে ফেলো
পরীক্ষার রুটিন পাওয়ার পর আমাদের প্রথম কাজ
হবে ঘরের ক্যালেন্ডারে পরীক্ষার
দিনগুলো দাগিয়ে ফেলা। রঙিন কালির একটি কলম
বা মার্কার দিয়ে ক্যালেন্ডারে লিখে ফেলো
কোনদিন কোন পরীক্ষার তারিখ দেয়া
হয়েছে। আর ক্যালেন্ডারটি এমন জায়গায় থাকা
উচিৎ যাতে তা সবসময়ই আমাদের চোখের
সামনে থাকে। ক্যালেন্ডারে তারিখগুলো
দাগিয়ে ফেললে পরে আমরা একটি পরিষ্কার
ধারণা পাবো প্রতিটা পরীক্ষার মাঝে আমরা
কীরকম বিরতি পাচ্ছি। পরীক্ষার তারিখগুলো কি
খুব কাছাকাছি পরে গিয়েছে নাকি একটা পরীক্ষার
পর পরবর্তী পরীক্ষার মাঝে আমরা ভালোই
বন্ধ পাচ্ছি। এই বন্ধের উপরই নির্ভর করবে
আমাদের পরীক্ষা প্রস্তুতির রুটিন কীভাবে
সাজাবো।
২. কোন পরীক্ষাগুলো বেশি
কঠিন তা বাছাই করো
এ কথা সত্য যে, সব বিষয়ে আমরা সমান পারদর্শি
না। কিছু বিষয় আছে যেগুলো আমাদের কাছে
অনেক সহজ। পরীক্ষার আগে একদিন
পড়লেই সেগুলোর সিলেবাস শেষ হয়ে
যায়। আবার কিছু বিষয় আছে যেগুলো
আমাদের কাছে অন্যান্য বিষয়ের থেকে
তুলনামূলক কঠিন কিংবা সে সব বিষয়ে আমাদের
প্রস্তুতি তেমন একটা ভালো না। সেগুলোর
জন্য আমাদের বাড়তি সময় দিয়ে পড়া লাগে যাতে
প্রস্তুতি ভালো হয়। তাই কোন কোন বিষয়ের
প্রতি আমাদের বেশি সময় দেয়া উচিৎ তা
শুরুতেই ঠিক করে ফেলতে হবে। এসব
বিষয়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আমরা
আমাদের পরীক্ষার রুটিন বানাবো।
পরীক্ষার সময় নির্দিষ্ট পরিকল্পনা কর
জরুরি; image source: campusinfo.
৩. বাঁধা-ধরা সময় মেনে চলা বর্জন
করো
পরীক্ষার সময় অনেকেই এমন চিন্তা করে
যে, দিনে ১২-১৪ ঘন্টা করে না পড়লে
পরীক্ষার প্রস্তুতি মোটেও ভালো হবে না।
তাই তারা অনেক সময় খাওয়া-দাওয়া এমনকি
গোসলের চিন্তা বাদ দিয়েও সারাদিন লাগিয়ে
কেবল পড়েই যায়। এটা একধরণের মানসিক চাপ
তৈরি করা ছাড়া আর কিছুই করে না। পরীক্ষার সময়
নিজেকে যতোটা সম্ভব চাপমুক্ত রাখতে হয়।
সেখানে নিজে থেকে চাপ তৈরি করার
কোনো প্রয়োজনই নেই। সময়ের হিসাব
ধরে না পড়ে তোমার উচিৎ নির্দিষ্ট টপিক ধরে
ধরে আগানো। কারণ তোমার প্রস্তুতির জন্য
দরকার পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত টপিকগুলো
ভালোভাবে পড়ে যাওয়া। তাই সময়ের সাথে
পাল্লা দিয়ে প্রস্তুতি নিতে চাওয়াটা আসলে একটি
বোকামি মাত্র।
৪. কোন সময়ে পড়া সবচেয়ে
ভালো হয় তা ঠিক করে রাখো
কোন সময়ে পড়তে বসলে তা সবচেয়ে
কার্যকর হবে এ নিয়ে আছে নানা বিতর্ক। কেউ
বলে সকালের পড়া মনে থাকে ভালো।
কারোও আবার সন্ধার সময় পড়তে বসার অভ্যাস
রয়েছে। কেউ কেউ আছে রাত ছাড়া
পড়তেই পারে না। অনেকে আবার সারাদিন
ঘুমিয়ে রাতের পেঁচা হয়ে পড়তে বসে। নানান
জনের নানান অভ্যাস। কিন্তু মজার বিষয় হলো
পড়তে বসার জন্য সবার সময়ই সঠিক যদি নিজের
“দেহঘড়ি” তাতে সায় দেয়। আমরা কখন ঘুমাবো,
কখন খাবো, কখন ঘুম থেকে উঠবো
এসবের জন্য কিন্তু আমাদের দেহ নিজে
থেকেই একটি রুটিন বানিয়ে নিয়েছে।
অনেকদিনের অভ্যাসের ফলে এই রুটিন তৈরি
হয় যাকে আমরা দেহঘড়ি বলে সম্বোধন করি।
এই রুটিন অনুযায়ী যে সময়ে পড়তে বসা
আমাদের জন্য উপযোগী, সেই সময়েই
আসলে পড়তে বসা উচিৎ।
৫. পরীক্ষার আগে কয়দিন সময়
হাতে পাচ্ছো তা খেয়াল করো
পরীক্ষার জন্য সব টপিক পড়তে পারবে কিনা তা
নির্ভর করছে তুমি কীরকম সময় হাতে
পাচ্ছো। অনেক সময় দেখা যায় তুলনামূলক
সহজ একটি পরীক্ষার আগে ৩-৪ দিন বন্ধ দেয়া
আছে কিন্তু বেশ কঠিন এবং অধিক গুরুত্বপূর্ণ
একটি পরীক্ষার আগে মাত্র ১ দিন অথবা
কোনো ক্ষেত্রে বন্ধই রাখেনি! এসব
ক্ষেত্রে সহজ পরীক্ষার আগে যে বন্ধ
আছে, সেই বন্ধের মাঝেই পরের
পরীক্ষার পড়া এগিয়ে রাখতে হয়। অনেকেই
মনে করে পরীক্ষার আগে যে কয়দিন বন্ধ
থাকবে, কেবল সেই কয়দিনই ঐ পরীক্ষার
জন্য পড়লে হয়ে যাবে। কিন্তু এটি একটি ভুল
ধারণা। পরীক্ষার প্রশ্ন তো আর বন্ধ দেখে
করা হবে না। তাই না? এজন্য এক পরীক্ষার
আগে ভালো বন্ধ পেলে সুযোগ থাকলে
আমরা পরবর্তী পরীক্ষার জন্যও কিছু পড়া
এগিয়ে রাখবো।
৬. কী পড়বে তা আগে
থেকে ঠিক করে নাও
বেশিরভাগ সময় দেখা যায়, পড়া শুরু করার সময়
শিক্ষার্থীরা সিলেবাস খুলে একদম প্রথম
থেকে পড়া শুরু করে দেয়। এটি আসলে একটি
ভুল কাজ। পরীক্ষার পড়া শুরু করা উচিৎ টপিকের
গুরুত্ব বিবেচনা করে। তুমি যদি শুরুতেই সহজ
অধ্যায়গুলো মনোযোগ দিয়ে পড়তে গিয়ে
দিন পাড় করে ফেলো, তাহলে দিনের
শেষে কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো ধরার
সময়ই পাবে না। এখানে সময় হিসাব করে পড়ার
একটি বিষয় চলে আসে। সেটি নিয়ে আমরা একটু
পরেই আলোচনা করবো। আগে আমাদের
ঠিক করে নিতে হবে কোন অধ্যায়গুলো
বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং কোন অধ্যায়গুলো
থেকে প্রশ্ন আসার সম্ভাবনা বেশি। বিগত
বছরগুলোর প্রশ্নব্যাংক ঘেঁটে দেখলেই
এর সমাধান পাওয়া সহজ হয়ে যাবে। এখন কথা
হলো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো আগে শেষ
করতে বলছি কেনো? বিখ্যাত লেখন ব্রায়ান
ট্র্যাসির “ইট দ্যাট ফ্রগ” বইয়ের একটি কথা তুলে
ধরছি। “তোমাকে যদি দুটো ব্যাঙ খেতে হয়,
তাহলে যেটি দেখতে কুৎসিত সেটি আগে
খাও।” এর মানে হলো, যেই কাজ করতে
তোমার কষ্ট বেশি হবে, সেটি আগে শেষ
করে ফেলো। এরপর সহজ কাজগুলো
আরামে শেষ করে ফেলো। এজন্য
পরীক্ষার পড়া শুরুর সময় কঠিন ও অধিক
গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো আগে শেষ করে
ফেলা উচিৎ। এরপর সহজ অধ্যায়গুলোতে হালকা
চোখ বুলিয়ে নিলে।
৭. সময় ধরে পড়ো এবং পড়ার
মাঝে মাঝে বিরতি দাও
কিছুক্ষণ আগেই বলেছি ধরা-বাঁধা সময়ের মাঝে
ঠিকমতো পড়া যায় না। এখন আবার বলছি সময়
ধরে পড়তে। আসলে দুটো দুধরণের বিষয়
এখানে তুলে ধরছি তোমাদের সামনে।
শুরুতে বলেছিলাম দিনে ১২-১৪ ঘন্টা পড়বো
এধরণের চিন্তা না রাখতে। তোমাকে পড়তে
হবে টপিক ধরে ধরে। দিনে এই কয়টি অধ্যায়
শেষ করবো এরকম লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে পড়া শুরু
করতে হবে। পড়া শুরুর সময় যেই টপিক বা
অধ্যায়টি পড়বো, তা শেষ করতে কতোক্ষণ
লাগতে পারে কিংবা বেলা কয়টার মধ্যে তুমি এই
অংশটি শেষ করতে চাও তা ঠিক করে রাখা উচিৎ। তুমি
যদি একটি লক্ষ্যমাত্রা স্থির রাখো যেমন, “দুপুর
১২টার মধ্যে তুমি ভেক্টরের সবকয়টি অংক
শেষ করে ফেলবে” তাহলে তোমার পড়ার
প্রতি মনোযোগ বেশি থাকবে এবং তোমার
পড়াও দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।
একই সাথে খেয়াল রাখবে টানা ১ ঘন্টার বেশি
কখনও পড়া উচিৎ নয়। ১ ঘন্টা পর পর ৫-১০
মিনিটের জন্য বিরতি দাও যাতে তোমার মস্তিষ্ক
গত ১ ঘন্টায় যতো তথ্য পেয়েছে তা
ঠিকমতো সাজিয়ে নিতে পারে। এই বিরতির
মাঝে তুমি চুপ করে শুয়ে থাকতে পারো কিংবা
হালকা কিছু খেয়ে নিতে পারো। মনে রাখবে,
পরীক্ষার সময় পড়ালেখার পাশাপাশি নিজের
স্বাস্থ্যের প্রতিও খেয়াল রাখতে হবে।
৮. বন্ধুদের পড়ায় সাহায্য করো
অনেকসময়ই আমাদের বন্ধুরা কল দিয়ে
কোনো টপিক বুঝিয়ে দেয়ার জন্য অনুরোধ
করে। যদি সম্ভব হয় তাহলে অবশ্যই তাদের পড়া
বুঝিয়ে দিতে সাহায্য করবে। এতে তাদের পড়া
পরিষ্কার হবার পাশাপাশি তোমার নিজের পড়াও হয়ে
যাবে। যদি জিজ্ঞাসা করা বিষয়টি আগে থেকে
পড়া হয়ে থাকে, তাহলে তো নতুন করে
রিভাইস হয়ে গেলো। আর যদি পড়া না হয়ে
থাকে, তাহলে পরবর্তীতে যখন পড়বে তখন
অবশ্যই সেই বন্ধুকে সাহায্য করবে। এতে
তোমার ডাবল পড়া হয়ে যাবে।
৯. ফোনের সবধরণের
নোটিফিকেশন বন্ধ করে
রাখো
অনেকসময় এমন হয় না যে, ৫ মিনিটের জন্য
ফোনটা হাতে নিলে ফেসবুকে একটু ঘুরে
আসবে ভেবে। কিন্তু স্ক্রল করতে করতে
কখন যে ৩০ মিনিট পার হয়ে গিয়েছে তার
কোনো খবরই নেই! এরকমটা যদি পরীক্ষার
সময় হয়ে থাকে তাহলে কিন্তু সমস্যা। তাই
পরীক্ষার সময় ফোনের নোটিফিকেশন
বন্ধ করে রাখো। সোশ্যাল মিডিয়ায় দুনিয়া
উল্টে যাক, সেটা তো তোমার পরীক্ষার
কাজে লাগছে না। তাই না? পড়ার কোনো
কাজে দরকার না লাগলে সম্ভব হলে
ফোনটিকেই হাতের সামনে থেকে দূরে
সরিয়ে রাখো। এটি তোমার মনোযোগ
সরে যাওয়া থেকে রক্ষা করবে।
পরীক্ষার হলে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ
source: Giphy
পরীক্ষার সময় নিজের মানসিক প্রস্তুতি খুবই
গুরুত্বপূর্ণ। যদি তোমার প্রস্তুতি ঠিকমতো
নেয়া হয়ে থাকে, তাহলে তোমার পরীক্ষার
ফল নিয়ে ভয় পাবার কোনো কারণই নেই।
পড়ালেখার পাশাপাশি খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, বিশ্রাম,
গোসল এসব দিকেও নজর রাখতে হবে।
পরীক্ষার আগের রাতে কখনও বেশি রাত
জাগার চেষ্টা করবে না। এটি তোমার পরীক্ষার
হলে একটি মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
পরীক্ষার সময় তুমি নিজেকে যতো চাপমুক্ত
রাখতে পারবে, ততোই তোমার জন্য ভালো।
সুন্দরভাবে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিলে সফলতা
আসবেই।


References:
1. https://www.monash.edu/rlo/study-
skills/preparing-for-exams/preparing-
an-exam-study-timetable
2. https://www.topuniversities.com/
student-info/health-and-support/exam-
preparation-ten-study-tips
3. http://ignitestudentlife.com/news/5-
feelings-every-student-goes-through-
during-exams/

No comments

Powered by Blogger.